কৈশোরের প্রিয় চরিত্র..বর্ণহীন বর্তমানে আমার ভালোথাকার বন্ধুরা

ছোটবেলায় সিনেমার হিরো, স্যুপারম্যান,বেন টেন কিংবা অসমসাহসী সিন্দাবাদ হতে চায় নি,এমন কাউকে পাওয়া যাবে না,একথা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা চলে।শৈশব-কৈশোরে পরিচিত হওয়া বই-পত্র, সিনেমা কিংবা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে থেকে উঠে আসা কিছু চরিত্র, অহর্ণীশ আমাদের হৃদয়ের অতলান্তিক গভীরতায় সযতনে আটকে থাকা আরশিতে ছাপ ফেলে যায়।

 নিজের অজান্তেই আমরা পথ চলি সেইসব প্রিয় চরিত্রগুলো সাথে। আমাদের মনোজগতকে আলোড়িত করা চরিত্রগুলো আমরা তুলে রাখি মনের গোপন বাকসে।ব্যস্ত এই ধাবমান সময়ে নিজেকে সময় দেয়ার মতো সময়ও যখন আমাদের থাকে না, তখন এই চরিত্রগুলো মনের রঙিন বাকসো থেকে বেরিয়ে আসে।পরম মমতায় হাত রাখে আমাদের হাতে।অবিরাম পথ চলার ক্লান্তি মুছে দেয়। আমরা আবার পথে নামি..। এমন কিছু চরিত্র নিয়ে লিখছি আজকে।

জিব্রাইলের ডানার কিশোর নায়ক নবী

“আজিমপুর হয়ে যে রাস্তাটা পিলখানা রোডের দিকে চলে গেছে, তারই বা পাশে গাছপালার ভেতর এগিয়ে গিয়ে একখানি ছোট কুটির। মরচেধরা বহু পুরোনো টিনের সুরাখ দিয়ে দেখা যায় নীল আসমান।” এভাবেই শুরু হয়েছে শাহেদ আলীর জিব্রাইলের ডানা। আমার কৈশোরের নায়ক, জিব্রাইলের ডানার কিশোর নবী তার অবহেলিত জীবনের অভিযোগবার্তা নিয়ে ঘুড়ি পাঠায় আসমানে। আরশে। আরশের পায়ায় রশি পড়িয়ে নামিয়ে আনবে মর্ত্যের পৃথিবীতে। ফনিমনসায় ঘেরা ছোট্ট গোপন আস্তানা থেকে আসমানের সুবিশাল বিস্তীর্ণতায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দোকান পালানো এক কিশোর। উড়ছে তার ঘুড়ি..।

আমি অবাক বিস্ময়ে দেখছি, ছোট্ট নবী কী অনায়াস প্রচেষ্টায় পৌঁছে দিচ্ছে আসমানে তার দুর্দশার চিঠি। কল্পনার স্বর্ণঈগল তার বার্তা নিয়ে ডানা মেলেছে আসমানে। জিব্রাইল পৌঁছে দিচ্ছে তার কথাহুলো মহামহিম স্রষ্টার কাছে। সেদিন নবী তার বার্তা আরশের ডাকবাক্সে পৌঁছুতে পেরেছিলো কিনা, জানি না। কিন্তু, সেদিনের সেই প্রত্যয়ী কিশোর আমার পছন্দের একজন হয়ে উঠেছিলো, একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি।

পথের পাঁচালীর অপু

মনে আছে নিশ্চিন্দিপুরের সেই অবাক চোখের কিশোর, নিস্পাপ পল্লীবালক অপুর কথা? পথের পাঁচালীর দুর্গার বোন অপুকে মনে পড়ে? আমি এই শতকের মানুষ। ওই আস্তাবলের মাথার উপরে যে আকাশটা ওরই ওপারে পূবদিকে বহুদূরে তাহাদের সেই ছোট্টগ্রাম নিশ্চিন্দিপুর আমি দেখি নি কখনো। দেখি নি, শাখারীপুকুর, ঘোঁষদের বাঁশতলা,দিগন্তুছোঁয়া সোনাডাঙ্গার মাঠ। দেখি নি, বর্ষার ঢল নামা ইছামতি আর জলমগ্ন শিমুলতলা। কিন্তু আমি চিলাম সেখানে। অপুর অবাক চোখ দিয়ে দেখেছি ঝোঁপেঝাড়ে ফোঁটা নাটাকাটা-বনকলমির ফুল। দেখেছি নীল অপরাজিতায় ছাওয়া, বনের ধারের মায়াময় অসংখ্য বিকেল।

অপু আমাকে দেখতে শিখিয়েছিলো পৃথিবীকে। অপু আমাকে শুনিয়েছিলো অন্য এক জীবনের গল্প। যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের..সর্বোপরি একজন মানুষের। যে জানে বেঁচে থাকার মুহুর্তগুলো কীভাবে সজীব রাখতে হয়।যে গল্প একান্তই মানুষের।রেলের থার্ডক্লাস বগির বাদুরঝোলা লোকটা কিংবা গ্রামের পথে ছিন্ন পোশাকপড়া উস্কুখুস্কু চুলের মেয়েটাও যে ভাবনার বিষয় হতে পারে, গভীরভাবে সিক্ত করতে পারে হৃদয়কে, আমি এটা শিখেছিলাম অপুর কাছে। এই বন তার শ্যামলতা নবীন স্পর্শটুকু তাহার আর তাহার দিদির মনে বুলাইয়া দিয়াছিলো। বোনাফল কিংবা বৈচির রস আমি কখনো আস্বাদন করি নি।

 প্রবল ঝড়ের রাতে জিরজিরে চালের ভাঙাফাঁকা দিয়ে জল ঝরে নি কখনো আমার গায়ে। আমার শৈশব কৈশোরে ছিলো না কোন আতুড়ি বুড়ি কিংবা ইন্দিরা ঠাকরুন।এই ইট-কাঠ-পাথেরর নাগরিক প্রাত্যহিকতায় কোন প্রান নেই। তবুও শৈশবের-কৈশোরের নিশ্চিন্দিপুর আমার সাথেই তাকে। পরম যত্নে হাত রাখে আমার হাতে। আমি পথ হাঁটি যান্ত্রিক এই নগরীতে, অবাক চোখের সেই অপুর সাথে..।

রবীন্দ্রনাথের ফটিক

ফটিক আসলে জীবনের তল খুঁজছিল। মৃত্যু এমন এক জগৎ যেটার কোনো তল পাওয়া যায় না। আর এই তল খোঁজার মধ্যে দিয়ে তার ছুটিটা হয়ে যাচ্ছে। এই ছুটি মানে জীবন থেকে ছুটি। যার নাম মৃত্যু। ফটিক আমার কৈশোরের আরেক ভালোবাসার চরিত্র। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের একটা সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। ‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা।। সেই সংজ্ঞার ভিতরে থেকে রবীন্দ্রনাথ চরিত্রচিত্রণে, পরিবেশচিত্রণে, সংলাপের ক্ষেত্রে অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর গল্প পড়তে শুরু করলে খুব সহজেই পাঠকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, এর ভেতরে ঢুকে যাওয়ার। প্রতিটি চরিত্রকে খুব পরিচিত মনে হয়।ছাপার অক্ষরের গল্পকে চোখের সামনে সেলুলয়েডের ফিতের মতো চিত্রায়িত হতে দেখা যায়।

এটিই তাঁর সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য।সবকিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত জীবনের খুব বড় একটা দর্শন বা খুব বড় একটা ব্যাপারকে সহজে উপস্থাপন করার মুন্সিয়ানা দেখান। ছুটি নামের গল্পটির মূল চরিত্র ছিল ফটিক নামের এক কিশোর। গল্পের কাহিনী এগিয়েছে গ্রামের একটি কিশোর ছেলেকে তার স্বাধীন মুক্ত জীবন থেকে শহরে ছোট্ট একটি খাঁচার মত একটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে যেয়ে বন্ধ খাচার ছোট্ট বাড়িতে ফটিক মারা গেল। মূল গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু গল্পের ব্যাখ্যাটা হচ্ছে ফটিককে যখন স্টিমারে করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন পথে যেতে সে দেখেছিল স্টিমারের খালাশিরা জল মাপে- এক বাঁও মেলে না, দুই বাঁও মেলে। এটা ফটিকের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল।

 মৃত্যুর মুহূর্তে ফটিকের মনে এ ব্যাপারটা চলে আসে। মারা যাওয়ার সময় তার চোখে ভাসছিল ওই জল মাপার দৃশ্যটা যে ‘এক বাঁও মেলে না, দুই বাঁও মেলে’। এর অর্থটা কী? গল্পটার নাম ছুটি কেন? এই প্রশ্ন সেদিন কিশোর আমার কাছে এক অমিমাংসিত রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নিজের অজান্তেই কখন যেনো আমি ফটিক হয়ে উঠেছিলাম,জানতেই পারি নি। কিন্তু এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এগুলো যত না প্রিয়, তার থেকে অনেক বেশি স্মৃতির একটা স্মারক, একটা উপলক্ষ বা অনুভূতির লিগেসি, হয়তো বা নস্টালজিয়া।

শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত

“কিন্তু কি করিয়া ভবঘুরে হইয়া পড়িলাম সে কথা বলিতে গেলে প্রভাত জীবনে এ নেশায় কে মাতাইয়া দিয়াছিল, তাহার একটু পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। তাহার নাম ইন্দ্রনাথ।“ “বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না- ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে। ছোটখাট প্রেমের সাধ্যও ছিল না- এই সুখৈশ্বর্য পরিপূর্ণ স্নেহ স্বর্গ হইতে মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য আমাকে আজ এক পদও নড়াইতে পারিত।” এমন অসংখ্য টুকরো টুকরো জৈবনিক ভাষ্য আর অনুপম রসদে গড়া হয়েছে আমার প্রিয় চরিত্র শ্রীকান্ত। দার্শনিক শিল্পী ও কবি-স্বভাব শরৎচন্দ্র তাঁর ‘শ্রীকান্ত’ প্রথমপর্বটি (১৯১৫) সাজিয়েছেন ভ্রমণকাহিনি ও আত্মজীবনীর এক দারুণ ও অভাবনীয় মিশেলে।

 তবে ‘আমি’কে দূরে রেখে শ্রীকান্তর দেখবার ও জানবার আনন্দ ও কৌশলের ভেতর দিয়েই নিজেকে প্রকাশ করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত ভাবনা ও অনুভূতির সাথে লেখক সহজেই মিলিয়ে দিতে পেরেছেন প্রকাশশৈলী, বর্ণনাচাতুর্য, কাব্যময়তা আর চরিত্রকে তাদের আপন আপন জায়গাটিতে দাঁড় করিয়ে উপস্থাপনের বিশেষ কায়দা। তবে বইটিতে ঘটনার সমাবেশ চোখে পড়ে না; লেখকের অনুভবজ্ঞান এবং আত্ম-আবিষ্কারের এক অপ্রকাশ মহাকাব্য এটি। কল্পনার চেয়ে এখানে অনুভূতির আন্তরিকতা বেশি। যে আন্তরিকতা আমাকে বারংবার আচ্ছ্বন্ন করেছে। আমি হঠাৎ করে কখনো উঠে পড়েছি অজানা কোন ট্রেনে।

 কল্পনায় তৈরী করে নিয়েছিলাম নিজের জগৎ। যেখানে রাজলক্ষী, ইন্দ্রনাথরা ‘শ্রীকান্ত’ একটি সাহিত্যিক-শৈল্পিক আত্মদর্শন, আত্মবিবরণ এবং আত্ম-প্রতিফলন। শ্রীকান্তের জীবনে ও চলার পথে প্রবেশ করা অন্নদাদিদি, পিয়ারী, রাজলক্ষী, অভয়া, সুনন্দা, কমললতা সকলেই প্রাতিস্বিকতায় আলাদা।আমার কৈশোরকে বোহেমিয়ানবোধে আক্রান্ত করে ফেলা শ্রীকান্ত আমাকে আজও তাড়িয়ে ফেরে। ফেলে-আসা দিনগুলোতে যে চরিত্রগুলো শ্রীকান্তের অনুভবকে তাড়িত ও শাণিত করেছে, তাদেরকে সে অনুভবের শৈল্পিক বারান্দায় স্থান দিয়েছে পরম মমতায়। আমি সেটা পারি নি। আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার অতীতকে।তাই বর্তমানের পথে দেখা মেলে না আলোকের রেখা। শুধুই কেবল ছুটে চলা।

 নির্লিপ্ততা কিংবা অনাসক্তির ভেতরেও যে প্রবল এক আকর্ষণ-আকর্ষণ কিংবা বিকর্ষণ-আকর্ষণ চেতনা খেলা করে তার বাস্তবতাকে শ্রীকান্ত অস্বীকার করতে পারে নি কিছুতেই। আর তাই, প্রেম-বিরহ-আকাক্ষা-আবেগ- এ সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে শ্রীকান্তের আভিজাত্য।যে জীবন আমি দেখেছি শ্রীকান্তের পাতায় পাতায়, সে জীবন অন্য কোন জীবনের কাছে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে প্রতিনিয়ত।

জাফর ইকবালের দীপু

“কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে ক্লাসের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রাঙ্গামাটি জেলা স্কুলে সদ্য অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া মুহম্মদ আমিনুল ইসলাম হক ওরফে দীপু হঠাৎ বুঝে গেলো রোলকল করতে থাকা রাশভারী শিক্ষক আসলে তার সাথে মজা করছেন। সেই মুহূর্তে কিভাবে যেন হঠাৎ সবাই দীপুর খুব আপন হয়ে গেলো। ফি-বছর বাবার বাউন্ডুলে স্বভাবের কারণে স্কুল পাল্টাতে বাধ্য হওয়া দীপুর এভাবে পুরো ক্লাসের সবাইকে একসাথে ভালো লেগে যাওয়াটা একটু অদ্ভুতই বটে।

 সেটা আরও মজার হল যখন সবাই হঠাৎ আবিস্কার করল যে এই ক্লাসে আরেকটা দিপু আছে। যেহেতু একজনের অঙ্ক ভুল গেলে আরেকজনের মার খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, সুতরাং ঠিক হল নতুন দিপুর নাম হবে দিপু নাম্বার টু।” এভাবেই শুরু হয় দীপু নাম্বার টু নামের বইটি। কিন্তু বিই অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটির দিপু চরিত্রটি ছিলো আমার প্রিয় চরিত্র।তখনও আমি বই টি পড়ি নি। সুতরাং আমার শৈশবের নায়কের একজন হয়ে গেলো সিনেমার দীপু। মুভিটি যেখান থেকে শুরু ঠিক সেখানেই শেষ।

একটি পাহাড়ি নদীর ধাঁরে বসে আছে দীপু। চারদিক উঁচু উঁচু পাহাড়ে ঘেরা, নদীতে সারি বেঁধে সাঁতার কাটছে হাসগুলো। বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ সেই আবহ ফুটে উঠেছে সিনেমাটির চলচ্চিত্রায়নে।দীপুর কথা আমার হৃদয়ের কোথায় যেনো আঁকা হয়েছিলো, জানার সুযোগ কখনো হয়ে উঠে নি।শুধু জানি, দীপুরা আমাকে কখনোই ছেড়ে যায় না।

হুমায়ূন আহমেদের শুভ্র

জোৎস্নার রাত। শহরের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে হেটে চলেছি। পরনে জিন্সের প্যান্ট, গায়ে খয়েরী রঙ্গের পান্জাবী। খুব ইচ্ছে ছিল হলুদ রংয়ের পান্জাবী পড়ে খালি পায়ে এরকম জোৎস্নার রাতে হাটার। কিন্তু সে ইচ্ছা অপূর্ন থেকে গেল। কারন আমার তো কোন হলুদ পান্জাবী নেই।এই চরিত্রটি সবার চেনা চরিত্র। নাম হিমু।হিমু আমার কৈশোরকে ছুঁতে পারে নি তেমন করে। কিন্তু, পেরেছিলো, হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দের শুভ্র। পৃথিবীর শুদ্ধতম মানুষ সে। দৈনন্দিন বাস্তবতা তাকে এখনো স্পর্শ করতে পারে নি। মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া একটু বোকা কিসিমের ছেলেটিকে আমি প্রথম দেখি দারুচিনি দ্বীপ নামের সম্ভবত ১৯৯১ কি ৯২ সালে ‘অনুপম’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ে।

 সুখেন দাস প্রচ্ছদ করেছিলেন। আমাদের শুভ্র চোখে কম দেখে। তাই বন্ধুরা তাকে কানাবাবা ডাকে। হিমুর মতো ছন্নছাড়া নয় সে। নয় মিসির আলির মতো যুক্তিনিষ্ঠও। একেবারেই আলাদা রকমের। হিমু এবং মিসির আলি যেমন আলো অন্ধকারে যাই টাইপের, শুভ্র তেমন না। তার জগৎটা শুধুই আলোর। পারিপার্শ্বিক হয়ত অন্ধকার কিন্তু সে নিজে আলোকিত এবং শুভ্র। হুমায়ূন আহমেদের যারা নিয়মিত পাঠক, তাদের বলি ‘সাদা গাড়ি’ গল্পটার কথা। শুভ্রর জগতটা দ্যুতিময়। আলোয় আলোময়। ছক করে লেখক এ আলোর জগৎ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এই জগৎ তো অবাস্তব। নিরেট আলোর জগৎ।

 সাদা রঙকে আরও সাদা করার বিজ্ঞানসম্মত উপায় আছে একটা। সাদা রঙের সঙ্গে অল্প পরিমাণ কালো রঙ মিশিয়ে দিতে হয়। শুভ্রর সাদা জগতে তাই অল্প একটু কালো লেখক ঠিক মিশিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা হলো শুভ্রর পারিপার্শ্বিকতার কালো। শুভ্রর বাবার পাড়ায় ঘর ছিল । বাবার মৃত্যুর পর ঘর বুঝে নিতে সেই পাড়ায় যেতে হয়েছিল শুভ্রকেও। কিন্তু পাড়ার ক্লেদ, রক্তমাংস-স্বেদ শুভ্রকে স্পর্শ করে নি একটুও। হিমুর মতো সে পাড়াকে দেখে নি, মিসির আলির মতো দেখে নি। তার দেখা একান্তই শুভ্রর মতো দেখা। মোট কথা হিমু এবং মিসির আলির চেয়ে একেবারেই আলাদা ধাঁচের চরিত্র শুভ্র। হয়তো একারেণই এই চরিত্র অত জনপ্রিয় হয় নি। কিন্তু, আমি আমার চারপাশে প্রায়ই দেখি শুভ্রকে।

 একটা সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া শুভ্র দাঁড়িয়ে ভিজছে তুমুল জ্যোৎস্নায়..। চারদিক সরে যাচ্ছে অতিদ্রুত ধাবমানতায়। শুধু শুভ্র আর সাদা গাড়ি আছে..। আর আছে আমার বর্ণহীন বর্তমান।

সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা

“হ্যাল্লো কিশোর বন্ধুরা,আমি কিশোর পাশা বলছি অ্যামিরিকার রকি বীচ থেকে। জায়গাটা লস অ্যাঞ্জেলসে, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে। হলিউড থেকে মাত্র কয়েকমাইল দূরে। যারা এখনও আমাদের পরিচয় জানো না, তাদের বলছি আমরা তিন বন্ধু একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলেছি। নাম তিন গোয়েন্দা।আমি বাঙালি, থাকি চাচা-চাচীর কাছে। দুই বন্ধুর একজনের নাম মুসা আমান। ব্যায়ামবীর, অ্যামিরিকার নিগ্রো, আরেকজন রবিন মিলফোর্ড, আইরিশ অ্যামিরিকান, বইয়ের পোকা। একই ক্লাসে পড়ি আমরা। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে লোহা-লক্কড়ের জঞ্জালের নিচে পুরোন এক মোবাইল হোম-এ আমাদের হেডকোয়ার্টার।” বইয়ের প্রথম দিকে লেখা থাকতো এই কথাগুলো। নীলক্ষেত্রের পুরোনো বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পড়ে ফেলতাম একেকটা বই।

তিন গোয়েন্দা বলতেই বোঝায় তিন কিশোরকে যারা রহস্য সমাধান করতে দারুন ভালবাসে। কিশোর পাশা,মুসা আমান ও রবিন মিল এই তিনজন কিশোরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তিন গোয়েন্দা কাহিনী। মাঝে মাঝে জিনা ও তার কুকুর রাফিও তাদের রহস্য সমাধানে সাহায্য করে। কিশোর পাশা তিন গোয়েন্দা সিরিজের প্রধান চরিত্র,গোয়েন্দা প্রধান। কিশোর বাংলাদেশি,মাত্র ৭ বছর বয়সে বাবা মা দুজনকেই গাড়ি দুর্ঘটনায় হারায়। চাচা রাশেদ পাশা ও চাচী মেরিয়ান পাশার কাছেই সে মানুষ। রাশেদ পাশা রকি বিচে একটি স্যালভিজ ইয়ার্ডের মালিক। কিশোরের কোঁকড়া চুল,কালো চোখ,বুদ্ধি দীপ্ত চেহারা কিশোরীদের দারুন পছন্দ। চমৎকার অভিনয়ও করে সে। ইলেক্ট্রনিক্সের কাজে দারুন পটু, ইলেকট্রনিক্সের জাদুকরও বলা চলে। কিশোরের একটা মুদ্রা দোষ আছে,গভীর চিন্তায় থাকা কালীন সে নিচের ঠোঁটে ক্রমাগত চিমটি কাটতে থাকে।

 মুসা আমান- মুসা আফ্রিকান আমেরিকান। তিন গোয়েন্দা সিরিজের দ্বিতীয় চরিত্র। রকি বীচে বাবা মায়ের সাথেই তার বসবাস। মুসার বাবা রাফাত আমান হলিউডের বড় টেকনিশিয়ান আর মা একজন গৃহিণী। খেতে দারুন ভালবাসে মুসা,কিন্তু শরীর চর্চাও নিয়মিত করে। মুসার মজার কিছু মুদ্রা দোষ আছে, যেমন কথায় কথায় খাইসে বা ইয়াল্লা বলা। মুসা ভূত খুব ভয় পায়,কিন্তু বিপদের সময় এই মুসাই সব থেকে বেশি সাহসী হয়ে উঠে। মুসার আরেকটি গুন হল সে বেশ দক্ষতার সাথে বিমান চালাতে পারে। রবিন মিলফোর্ড- তিন গোয়েন্দার আরেক গোয়েন্দা রবিন মিলফোর্ড। রবিন আয়ারল্যান্ডের ছেলে,থাকে বাবা মায়ের সাথে রকি বীচে। তার বাবা একজন সাংবাদিক আর মা গৃহিণী। রবিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিন গোয়েন্দার সমস্ত কেসের রেকর্ড রাখা। পাহাড়ে চড়তে দারুন ওস্তাদ সে,বই পড়তেও খুব ভালবাসে। রকি বীচ লাইব্রেরীতে একটি খণ্ড কালীন চাকরি করে রবিন। রবিনের সুন্দর চেহারা ও শান্ত শিষ্ট স্বভাবের কারনে মেয়েদের কাছে দারুন জনপ্রিয় সে। অন্যান্য চরিত্র- তিন গোয়েন্দার অন্যান্য চরিত্র গুলোর মধ্যে জিনা পারকার অন্যতম।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী হ্যারিসন জোনাথান পারকারের এক মাত্র মেয়ে জিনা। জিনা নিজেকে ছেলে ভাবতে খুব ভালবাসে ,তাই বেশির ভাগ সময় ছেলেদের মতো পোশাক পরে থাকে। জিনা রকি বীচে থাকে না,মাঝে মধ্যে ছুটি কাটাতে আসে। তার আছে দারুন বুদ্ধিমান একটি কুকুর,নাম রাফিয়ান। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রগুলোর ভেতর ডেভিড ক্রিস্টোফার,ভিক্টর সাইমন,ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার,ওমর শরীফ,টেরিয়াল ডয়েল তথা শুটকি টেরি,ফগরাম্পার কট, ববরাম্পারকট উল্লেযোগ্য। ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৩ সাল,দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে তিন গোয়েন্দা সিরিজের বইগুলো আমাদের দেশের শিশু কিশোরদের আনন্দ দিয়ে আসছে। স্বপ্ন দেখতাম এই তিন গোয়েন্দার গোপন হেড কোয়ার্টারে ঢোকার। ওদের সাথে রকি বীচের পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানোর কিংবা গোবেল দ্বীপের পুরনো কোনো বাতিঘরে গোপন রহস্যের সমাধান করতে। ভাবতাম ,ফগরেম্পারকট কে একটু ভয় দেখাতে পারলে মন্দ হয়না । ভাবতাম ওদের খুঁজে বের করার জন্যই আমাকে ওখানে যেতে হবে। তিন গোয়েন্দার কিশোর ,মুসা,রবিন আরও হাজার বছর আমাদের যান্ত্রিক জীবনে আনন্দের খোরাক হয়ে থাকুক।

শেষের কথা

আরো অসংখ্য চরিত্র আমার শৈশব-কৈশোরের প্রতিটি মুহুর্তকে সঙ্গ দিয়েছে। শিখিয়েছে ভালো থাকতে। শিখিয়েছে নিজের ভেতরে উঁকি দিয়ে নিজেকে দেখে নিতে। নজরুলের লিচুচোর, রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর,গ্রেগরি পেকের দুর্দান্ত অভিনয়, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা, শরৎচন্দ্রের মেজদা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, শির্শেন্দুর দূরবীনের ধ্রুব, কালবেলার মাধবীলতা, লালসালুর মজিদ,সংসপ্তকের রমজান, আঙ্কল টম, অলিবার টুইষ্ট, হ্যারি পটার, সিডনী স্যালডনের ,টিনটিনের ,এনিড ব্লাইটন, আ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, শার্লক হোমস সহ অসংখ্য প্রিয় চরিত্র আমার শৈশব-কৈশোরকে বুঁদ করে রেখেছিল।

কৈশোরের প্রেম ছিনতাই করা সেইসব চরিত্রগুলো আজও পথ হাঁটতে বন্ধুর মতো আমার সঙ্গী হয়।এই যান্ত্রিক সময়ের আমার চারপাশ জুড়ে তৈরী করে দেয় প্রান্তমুক্ত বন্ধনহীন এক মুক্ত জগতের। যে জগতের কোন কালিক পরিধি নেই। বহুলৌকিক আলোকময় সুষম শান্তিময়তায় নির্মিত সে জগতে নিরাপদ আমি।ছুটে চলার ক্লান্তি আমায় স্পর্শ করে না সেখানে। সেখানে শুধুই ভালোথাকার গল্প তৈরী হয়..। শুধুই কেবল বেঁচে থাকা, শতভাগ সজীবতায়..।

{একটি মাসিক পত্রিকায় অন্তরা জাহান  ছদ্মনামে প্রকাশিত। অন্তরা জাহান আমার একজন প্রিয় মানুষ। লেখার হাত খুব ভালো হওয়া সত্ত্বেও লিখতে অনীহা তার। তাই, তাকে সারপ্রাইজ দেয়ার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।  }

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন