আকাশের ঠিকানায় লিখছি তোকে…

প্রিয়,
চিঠির শুরুতে ‘’কেমন আছিস?’’ জাতীয় বাক্য ব্যবহার করাই হয়তো সামাজিক রেওয়াজ। কিন্তু, আমি সেটা জিজ্ঞেস করবো না। কারণ, আমাদের সম্পর্কটাই যে বড়ো বেশি অন্যরকম! যখন তোকে লিখছি, কাকতালীয় হলেও প্রতিবারের মতো আকাশে তখনও ঝুলে আছে ম্লান , বিষণ্ণ, ভয়ানক একা , একটা চাঁদ।
কি অবাক কান্ড বলতো! তোকে যখনই লিখতে বসি, তখনই কি করে যেনো টের পেয়ে যায় এই রাতের প্রহরী! তোর মাথার পাশের জানালার গরাদের ফাঁক গলে নিশ্চয়ই এখন ঝরে পড়ছে জ্যোৎস্নার অজস্র সাদা ফুল! শীত-কাতর রাতের নীরব নিঝুম নৈঃশব্দের মাঝে হঠাৎ কোন নিশাচর পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ নিশ্চয়ই তোর ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে না!
আমার ছোট্ট রুমের সবকিছু এখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন। আমি বসে আছি। লিখছি তোকে। আসলে, কী লিখছি আমি? যা বলতে চাই, সেটা কি বলতে পারবো কিংবা পারছি? জানি না…।
পৃথিবীর বিশালতা আজন্ম আমাকে অবাক করে। এতো এতো মানুষ চারদিকে! আমার প্রায়ই মনে হতে থাকে, আমি বোধহয় একদিন আমার নাম পরিচয় সব হারিয়ে ফেলবো এই সব মানুষের ভিড়ে। সেদিন আমার কোন নাম থাকবে না। আমি একজন অপরিচিত আগন্তুক, হেঁটে বেড়াবো শহরের দমবন্ধ হওয়া, জঞ্জালভরা পিচের রাস্তায়।
জীবনকে আমার কাছে একসময় মনে হতো একটা অর্থহীন ছেঁড়া খাতা। দিন রাতের কোন হিসেব আমার কখনোই মিলতো না। বহু কষ্টে বয়ে নিয়ে যেতাম জীবনটাকে। হঠাৎ একদিন কি যে হলো! এটাকে দূর্ঘটনা বলেই ডাকি আমি।
কোত্থেকে যেনো তুই এলি! আমার প্রচলিত সব জীবন, সব হতাশার অনিঃশেষ কালো, কোথায় যে ভেসে গেলো! লক্ষ্যহীন বাউন্ডুলে এই আমিটা, কেমন সংসারী হয়ে গেলাম! নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া-ঘুম আমার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠলো। রাতের আকাশে নির্ঘুম জেগে থাকা রাশি রাশি তারাদের সাথে আমার যোগাযোগ একপ্রকার বন্ধই হয়ে গেলো। সবকিছু এমনভাবে বদলে গেলো!
আমি কখনো ভাবিনি, কোন একটা কাউকে ভেবে আমার সারাবেলা কেটে যাবে! কেউ একজন আমাকে ভীষণ দরদ দিয়ে জীবনকে ফিরিয়ে আনবে আমার আঙিনায়! ফিরিয়ে দেবে আমার ভেতরের শুকিয়ে যাওয়া হাসিগুলো! আমার গহীন অন্দরে এতো আনন্দধারা ঘুমিয়ে ছিলো, তোর সাথে পরিচয় হবার আগে, আমি কখনো সেটা বুঝতেই পারিনি!
ধীরে ধীরে বয়ে গেছে সময়ের পরিক্রমা। আমি পড়তে শিখেছি তোর নীরবতার ভাষা। বুঝতে শিখেছি তোকে, তোর ভেতরের ভীষণ অন্যরকম মানুষটাকে। নিজের ভেতরে এতো কষ্ট জমিয়ে রেখেও কেউ শুধুমাত্র অন্যের জন্য এমন করে হাসতে পারে! অন্যের একটু আনন্দ, একটু সুখের জন্য সবকিছু ভুলে গিয়ে ভালোর থাকার অভিনয় করার কষ্টটুকু কেউ কখনো করে!
আমার মতো একজন চালচুলোহীন বোহেমিয়ান উৎপাতকে, কেউ কখনো হাতে হাত রেখে বলবে, এখনো আগের মতো একা লাগছে? এটা ছিলো অবিশ্বাস্য রকমের কল্পনা!
আজকে লিখতে গিয়ে অনেক কিছু মনে পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে এই নীরব রাতের একলা প্রহরে, বড়ো বেশি অসহায় লাগছে রে। কেনো জানিস? তোর কষ্টগুলো মুছে দিতে আমি পারি না বলে। তোর জন্য একটু সুখ এনে দিতে পারি না বলে। সারাক্ষণ খুঁজে বেড়াই, কি করলে তোর একটু ভালো লাগবে। কি করলে, তুই খুব করে হাসবি প্রাণখুলে।
তোর হাসি দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে রে। কিন্তু, আমি পারি না। তোর হাসিগুলো আমাদের চারপাশের কঠিন বাস্তবতার কর্কশ আঘাতে মলিন হয়ে যায়। তোর ভেতরের ছোট্ট পাগলিটাকে সত্যি আমি খুব পছন্দ করি। আমরা প্রিয়টাকে সত্যিই আমি অনেক বেশিই ভালোবাসি।
আমি জানি, হয়তো আমার ভালোবাসা তুই কখনোও জানবিও না। হয়তো এই ভালোবাসার অর্ঘ্য ধুলোয় লুটোবে। তবুও আমি আমার প্রিয়টাকে অসম্ভব বেশি ভালোবাসি। ভালোবাসা না পয়েও ভালোবেসে যাই আশ্লেষে। আমি খুব করে বিশ্বাস করি, ভালোবাসা কখনো বৃথা যায় না।
আমার বিশ্বাস, সৃষ্টা একদিন তোর জীবনটাকে পূর্ণ করে দেবেই। সুখের অবিরল ধারাপাতে ভেসে যেতে থাকবে তুই , তোর প্রিয় মানুষগুলো। আমি আছি প্রিয়, তোর খুব কাছেই। যখন ইচ্ছে, ডাকিস আমায়। আমি পৌঁছে যাবো। মনে রাখিস, কেউ একজন তো র পথ চেয়ে বসে আছে। বসে থাকবে অনন্তকাল ধরে…। হয়তো তুই আসবি, কিংবা, হয়তো আসবি না। তবুও, সে অপেক্ষা করবে তোর জন্য।
কি বলবো বলে শুরু করেছিলাম, সেটা এখন আর মনে করতে পারছি না। সবকথা আজকেই বলে ফেলতে হবে, এমন কোন কথাও নেই। পরে আবার বলার সুয়োগ হবে, এমন নিশ্চয়তা দিচ্ছি না। তবুও, আজকে এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকিস প্রিয়। নিজের প্রতি যত্ন নিস। সময় মতো খাওয়া-দাওয়া করিস। আমার সবসুখগুলো নিয়ে হলেও ভীষণ ভালো থাকিস। শুভ কামনা রইলো, সবসময়ের জন্য।
তোর চিঠির অপেক্ষায় থাকবো।

ইতি
একজন না-মানুষ

মন্তব্য করুন