রাতুলের কপোতাক্ষ নদ কিংবা সাধারণ একটি বাথটাবের গল্প

রাতুলের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির কলাভবনের পাশের রাস্তায়। ঝকঝকে চেহারার ছেলে। চোখের চশমা আর বড়ো ডায়ালের হাতঘড়িতে রীতিমতো স্মার্ট বলা চলে। জীবনের পথচলার ধরণ ভিন্ন হওয়ার কারনেই হয়তো খুব ঝকঝকে চেহারার মানুষদের সাথে আমার একটা অদ্ভূত দূরত্ব থাকে প্রথম থেকেই। কারণ, আমার মনে হয়, আমাকে বুঝতে পারার মতো সময় এবং মানসিকতা তাদের থাকবে না।

রাতুলের ক্ষেত্রেও সেই ভয়টা ছিলো। কিন্তু, প্রথম কথা বলার সময়ই মনে হলো, রাতুল ভালো আছে। যশোরে বেড়ে উঠা কপোতাক্ষ পাড়ের হাওয়া-জলে মানুষ, রাতুল কি আসলেই এই শহরে ভালো আছে? ইট-কাঠ-পাথরের জঞ্জালের এই ভালোবাসাহীন শহর , ওকে ঠিক কতোটা আপন করে নিয়েছে, আদৌ নিয়েছে কিনা, আমার জানা হয় না।

অনেকটা সময় নিয়ে আমাদের কথা হয়..। গল্প হয়..। নানান বিষয় আর অর্থক-অনর্থক শব্দেরা ইতিউতি গড়িয়ে পড়ে ছড়িয়ে চলে চারদিকে..। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। ট্রান্সপোর্ট ইয়ার্ড আর পিঠাচত্তরে ভিড় বাড়তে থাকে। ভেসে আসতে তাকে চারদিক থেকে, সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরা পাখিদের কোলাহোল। কুপির আলো আর মামাদের হাঁকডাকে সরগরম পিঠাচত্তরে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলি..।

আমি রাতুলকে দেখি..। ভাবি, কপোতাক্ষ নদ, মাইকেল মধুসূদন ছেড়ে এই শিউলি ফুলের ঘ্রাণহীণ শহরে, আসলেই কি রাতুল নিজের মতো থাকছে? নাকি, প্রতিদিনের এই ব্যস্ততার মাঝে হারিয়ে গেছে আমাদের সত্যিকারের রাতুল! জানি না। জানা হয় না।

তবে, আলাপে আলাপে জেনে যাই, রাতুলের একটা রাজকীয় বাথটাবের শখ। জলে শরীর ডুবিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটানোর স্বপ্ন ওর। বড়ো অন্যরকম সাধারণ স্বপ্ন। এই স্বপ্ন কি কপোতাক্ষ ছেড়ে আসা কিংবা কপোতাক্ষ না থাকার অমোচনীয় যন্ত্রণা থেকে আসে? সেটাও আমি বুঝে উঠতে পারি না।

কিন্তু, আমি প্রাণপনে চাই, রাতুলের কপোতাক্ষ থাকুক বহাল তবিয়তে। রাতুল হাসুক, ভালো থাকুক প্রিয়জনদের নিয়ে। প্রাণখোলা হাসি-আনন্দে-আড্ডায় মাতিয়ে রাখুক চারপাশ।

দিনশেষে ওর স্বপ্ন হোক, কপোতাক্ষের বুকে প্রিয় মানুষটির হাতে হাত রেখে, কোন এক অচেনা মাঝির ছোট্ট নাওয়ে একটি স্বর্নোজ্জ্বল সন্ধ্যার। শিউলি ফুলের ঘ্রাণমাখানো ছোট্ট একটি উঠোনের। রুপালি জ্যোৎস্নায় রাতভর ভিজতে থাকা একটি সুন্দর ঘরের..।

একটি স্বপ্নময় অপার্থিব উপসংহারের আশায় আমি, কপোতাক্ষ নদ আর রাতুলকে নিয়ে ভাবি..। প্রার্থনা করি…। ভালো থাকুক কপোতাক্ষ..বেঁচে থাকুক..।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন