বাবার সবুজ ট্রাঙ্কভর্তি স্বপ্ন নিয়ে একদিন জাদুর শহরে আমি

ঢাকায় আমি পাকাপাকিভাবে বসবাস করতে আসি ২০০০ সালে। উদ্দেশ্য উন্নতমানের পড়াশোনা করে বাবা-মায়ের স্বপ্নপূরণ। ভবিষ্যতের কিছু একটা হয়ে তারপর ততোধিক সফল জীবন-যাপন।

আমার ঢাকাযাত্রা উপলক্ষ্যে বাড়িতে তখন ব্যাপক তোড়-জোড় চলছে। গ্রামের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে আমাকে। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই সারাদিন..। কেউ কিচ্ছু বলে না। নাওয়া-খাওয়ার রুটিন গেছে ভেঙে। যা ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা চাইলেই পেয়ে যাচ্ছি। বেশ মজায় আছি আমি। বড়োদের ব্যস্ততা দেখতে ভালো লাগছে। বাড়ির উৎসব উৎসব আমেজ, সবার অতিরিক্ত আদর, পাত্তা দেয়া দেখে অবাক হলেও বেশ মজা পাচ্ছিলাম।

একদিন সকালে বাজার করে আসার সময় বাবা একটি বড়ো সাইজের রঙয়ের কৌটা কিনে আনলেন। সবুজ রঙ। আমাদের পুরোনো মিটসেফের গহীন অন্ধকার থেকে বের হলো কয়েক রকমের রঙের ব্রাশ। নারিকেল আইচায় ঢেলে নেয়া হলো কেরোসিন। বাবার কাছে জানতে চাইলাম, কী হবে এ’সব দিয়ে? বাবা জানালেন, আমার ট্রাঙ্ক রঙ করা হবে।

আমিতো মহাঅবাক! আমার আবার ট্রাঙ্ক কোথায়! আর, ট্রাঙ্ক দিয়ে আমি কী করবো! আমাদের বাড়িতে প্রামাণ সাইজের বেশ বড়ো মাপের কিছু ট্রাঙ্ক ছিলো। যেগুলো ব্যবহার হতো পুরোনো আমলের শীতের লেপ-তোশক রাখার কাজে। আমার কাছে ট্রাঙ্কের মানেই হচ্ছে সারা বছর জিনিসপত্র রেখে দেয়ার জন্য মস্ত সাইজের টিনের তোরঙ।

মায়ের পরিচালনায় বাবা-মা মিলে আমাদের ঘরের উপরের কার/র‌্যাক থেকে জীর্ণ-শীর্ণ ছোট আকারের একটা ট্রাঙ্ক বের করলেন। মরিচার অত্যাচারে জিরজিরে অবস্থা। ভেতরে অনেক বই। উইপোকার নিরাপদ আবাসে পরিনত হয়েছে সময়ের সাথে সাথে।

জোতির্বিজ্ঞান, আর্কিটেকচার, মায়ান হিস্টোরী আর ম্যাথ ইত্যাদি নানা অভিনব বিষয়ের বইয়ে ঠাঁসা ছিলো। বইগুলো ছিলো বাবার। তখন আমি জেনে গেছি বই পড়ার আনন্দ। বাবার কাছে জানতে চাইলাম, এখন আর তিনি বই পড়েন না কেনো? কোন জবাব সেদিন পাই নি। এখন এতোবছর পরে এসে বুঝতে পারি, তার ভেতরের পাঠক সত্ত্বার মৃত্যু ঘটেছিলো বহু আগে।

সেদিন সকাল থেকে সারাদিন লাগিয়ে আমি আর বাবা মিলে মহাউৎসাহে আমার ট্রাঙ্ক রঙ করলাম। সবুজ রঙের বদৌলতে ট্রাঙ্কের মরিচাধরা শরীরে কিছুটা আব্রু ফিরেছে। ছোট্ট একটা তালাও কিনে দেয়া হলো সাথে। ২ সেট নতুন গেঞ্জী, ২ সেট লুঙ্গি, একসেট জামা, মেলামাইনের প্লেট, স্টিলের ছোট বাটি, বড়ো ডানো দুধের বয়ামে ময়দার পিঠা, কেয়া সাবান, একজোড়া সেন্ডেলসহ আরো কিছু টুকিটাকিতে ভরা হলো ট্রাঙ্ক।  আমি খুশিতে বিভোর হয়ে আছি।  দারুণ একটা পিকনিক হবে। আমার একার পিকনিক! আমার এবার নিজস্ব সম্পত্তি হলো তাহলে! নিজস্ব সময় কাটানোর সুযোগ হচ্ছে!

সেই ট্রাঙ্ক আমার বাবার ছিলো। বাবার অপূর্ণ সব স্বপ্ন, নানা রঙের এ্যাডভেঞ্চার, পাঠক বাবার রাশিরাশি পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ, পাতার ভাঁজে কুপির তেলের দাগ, অজানা কোন কিশোরী মেয়ের দেয়া লেপটে যাওয়া ফাউন্টেন পেনের কালি মাখানো চিঠি,  সবকিছু নিয়ে আমি তৈরী হচ্ছিলাম নতুন জীবনের জন্য।

কী বিস্ময়কর সে যাত্রা! একজীবনের সব স্বাদ যেখানে এসে থেমে গেছে, সেখান থেকে নতুন কিশোরের আরেকটি নতুন অভিযাত্রার প্রারম্ভ!

অতঃপর কোন এক শীতের কুয়াশাভেজা ভোরে, সেই প্রিয় সবুজ রঙের ট্রাঙ্ক নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম নতুন পথে..। ভালোবাসাহীন লেনদেনের এই কংক্রিট শহরে…।

এই শহর আমাকে দিয়েছে অনেক কিছু..। বহুদামে আমি কিনেছি আমার যান্ত্রিকতার মুহুর্তগুলো। বাবাকে অনেক ভালোবেসেও আর বলতে পারি নি কখনো, বাবা, ভালোবাসি..। মাকে কখনো জড়িয়ে ধরে বলা হয় নি, মা, তোমার গায়ের ওমে আমি একটু ঘুমোতে চাই..। এই শহর প্রতিদিন প্রতিটি মুহুর্তে পাল্টে দিচ্ছে আমাকে..।

বাবার সেই সবুজ ট্রাঙ্ক আজও আছে। কিন্তু,সেদিনের সেই ট্রাঙ্কের নতুন মালিক, আমি আর সেদিনের মতো নেই।

আমি আবার ফিরতে চাই আমার শৈশবে…। আবার আমি ছুঁতে চাই আমার সেই সবুজ ট্রাঙ্ক..। পৃথিবীর সব কিশোরের সবুজ ট্রাঙ্কগুলো ভালো থাকুক..। সজীব থাকুক বাবা-মায়ের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার অনুভূতিগুলো…।

ভালো থাকুক আমার সবুজ ট্রাঙ্ক, তার সব জীর্ণতা নিয়ে..।

================

## ব্যবহৃত ছবিটি প্রতিকী। ইন্টারনেট থেকে নেয়া

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন