শ্রাবণের রাতে সবজিবোঝাই ভ্যান, ঝুম বৃষ্টি এবং আমার প্রথম উপার্জন

বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে মৌচাক-মালিবাগ সড়ক। রাত তখন ১ টা থেকে ২টা। আমি হেঁটে বেড়াচ্ছি। ঘুরে ফিরছি। রাতের শহর আমার কাছে সবসময়ই অন্যরকম। ভালোলাগার। পড়নে লুঙ্গি আর গেঞ্জি। একটু আগে মালিবাগ পদ্মা সিনেমা হলের কাছে কয়েকজন ট্রাক-শ্রমিকের সাথে ফুটপাতে বসে চা খেয়েছি। হাত-পা ছড়িয়ে বসে গল্প করেছি। শুনেছি তাদের গল্প..। দূরের কোন ছোট্ট গায়ে রেখে আসা আদরের কন্যা ফাতেমা, ময়না আর শিখা রানীদের ছোট ছোট কাহিনী। শুনি ওদের মায়েদের সাথে খুনসুটি কিংবা শহুরে ভাষায় রোমান্টিকতার উপাখ্যান।

বড়ো ভালো লাগে আমার। এখানে কোন ঢং নেই। ভড়ং নেই। অহেতুক মিথ্যা করে হাসার আনুষ্ঠানিকতা নেই। কিন্তু, এখানের জীবন অনেক কঠিন। এখানে অভাব আছে বড়ো কঠিন রকমের। আছে দিনের পর দিন রুটি কিংবা পুরি খেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা। আছে না খেয়ে বেঁচে থাকার জান্তব মানুষ।

গল্প শেষে বেড়িয়েছি অনেক্ষণ। এরই মধ্যে নামলো ঝুম বৃষ্টি। লোডশেডিংয়ে মুখ গুজে পড়ে আছে এই জাদুর শহর। আমি পায়ে পায়ে হাঁটছি। খুঁজছি নিজের হারিয়ে ফেলা মানুষকে। এই পথের কোন শেষ নেই। শেষ থাকেও না কখনো। গন্তব্যহীন এই পথ চলার ক্লান্তি আমাকে আরো হাঁটার তাগাদা দিতে থাকে।

মৌচাক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। দেখলাম সবজিবোঝাই একটি রিকশাভ্যান ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একজন। খুব ধীরগতি। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, কী মিয়া? কোন সমস্যা আছে মনে লয়? আমাকে দেখে ভ্যানচালক থামলেন।

তারপর বললেন, আরে বাপজান, মাল বেশি লোড হইয়্যে গেছে। হের উপর এই মরার বৃষ্টি। বেবাক মালের ওজন কয়গুনা হইছে আল্লাহ মালুম। আমনে কোন কিছু করতেন ফারবেন নি?

আমি এগিয়ে গিয়ে ভ্যানের কাছে দাঁড়ালাম। বললাম, কাকু, আমি আমনের ভ্যান ঠেইলা এই পানির বন্যা পার কইরা দিমু। আমারে পাঁচ টাকা দিয়েন। রাজি থাকলে কন..। উনি রাজি হলেন। আমি শুরু করলাম ভ্যান ঠেলা।

চারদিকে বৃষ্টির পানি জমে হাঁটুজল। সবজিতে বোঝাই রিকশা-ভ্যান। ঠেলে নিয়ে চলেছি রাজারবাগের দিকে। সিন্দাবাদের সাতসাগরের গল্প শোনা আমি ভ্যান ঠেলে নিয়ে চলেছি শহুরে সমুদ্রের জল ভেঙে।  উপার্জনের ইচ্ছা সেদিন কেনো হয়েছিলো, আজ অনেকদিন পর এসে এখন আর মনে করতে পারি না। সেদিনের ভাবনার অনুবাদ অসম্ভব মনে হয়। তবে, নতুন ভাবনা এসে জড়ো হয়।

সেদিনের সেই রিকশা-ভ্যানের মতো, আজও কি আমি ঠেলে নিয়ে চলেছি না নিজেকে? আমার চারপাশের চকচকে টিপটপ পরিবেশে বেমানান আমি , টিকে থাকার জন্য কী আপ্রাণ চেষ্টাই না করছি! কখনো পাল্টে নিচ্ছি গ্রামের বোল। কখনো বদলে ফেলছি পোশাক-আশাক। তারপরও টিকে থাকার উদগ্র বাসনা ক্রমে ক্রমে গাঢ় হচ্ছে। সেই ভানচালকের মতো রাস্তার নোংরা কাদা-জল পেরিয়ে নিজেকে যেনো নতুন কোন উচ্চতায় দেখার অলীক প্রত্যাশা!

পাঁচটাকার নোটের বদলে সেদিন চেয়ে নিয়েছিলাম কয়েন। পাঁচটাকার ময়লা পয়সা। আমার প্রথম উপার্জন! তারপর,  সেই টাকায় পদ্মা সিনেমা হলের চায়ের দোকানে রাতের সঙ্গীরা সবাই মিলে চা খেয়েছিলাম। গরম ধোঁয়া উঠা চা। পরম তৃপ্তিতে।

এখন আমার কাজ সারাদিন পর্দাটানা রুমে,  কম্পিউটারের সামনে বসে। মাসিক বেতন অল্প হলেও সোজা জমা হয় ব্যাংক এ্যাকাউন্টে।  এখনো আমি চা খাই। কিন্তু, পদ্মা সিনেমা হলের সামনের সেই মানুষগুলোকে আর পাই না। সেখানে নতুন মানুষ এসেছে। পাল্টে গেছে শহরের চেহারা। এখন এই শহরে রাতের ঘ্রাণ নেয়ার সুযোগ নেই আমাদের। সারাদিন অফিস করে পিসিতে মুভি দেখে গভীর রাতে ঘুমোতে যাই। রাত দেখি না। ভোর দেখি না। সকালের সোনারোদ এখন আর ছুঁয়ে দেখা হয় না। কী সব দিন ছিলো! সেই পাঁচটাকার কয়েন, ফুটপাতে রাতের পর রাত চা খেতে খেতে গল্প শোনা, রাতের শহরে ঘুরে বেড়ানোর সময়গুলো কোথায় যেনো হারিয়ে ফেলেছি।

এখনো রাত আসে..। আদি ও অকৃত্রিম পুরোনো গন্ধমাখা রাত..। কিন্তু, আমার সেই রাতগুলো আর ফিরে না। তবুও আমি ফিরতে চাই সেই সবজিবোঝাই ভ্যান আর ঝুম বৃষ্টির  প্রিয় শহরে..।

===================

# Photo Credit: Md. Shahanoor Mamun

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন